সবার ওপরে জাফলং

সিলেটের জাফলং [Jaflong] সারাদেশে ‘প্রকৃতিকন্যা’ বলে এক নামে পরিচিত। কারণ এখানে ঘটেছে প্রকৃতির সুন্দরতম দুই জিনিস পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন। স্বচ্ছসলিলা পিয়াইন নদীর দুই পারে দেয়ালের মতো খাড়া হয়ে উঠে গেছে উঁচু পাহাড়। নদীমাতৃক দেশের পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় নদী-পাহাড়ের মিলনস্থল আরো আছে সিলেটে—যেমন সাদা পাথর, বিছানাকান্দিলোভাছড়া—তবে সেসব জায়গায় পাহাড় এত খাড়া আর উঁচু নয়। তাই এই দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ‘সবার উপরে জাফলং সুন্দর তাহার উপরে নাই’।

জাফলং, সিলেট। Jaflong, Sylhet.
জাফলং, প্রকৃতির বর্ণশোভায় অনন্য।

জাফলংয়ের সৌন্দর্যের বয়ান

মেঘালয় সীমান্তে খাসিয়া-জৈন্তা পর্বতমালার ঠিক নিচে গড়ে ওঠা এক টুকরো স্বর্গের নাম জাফলং। বরফগলা ঝর্ণাধারা পাহাড় থেকে এখানে নেমে এসে হয়েছে নদী। নদীর নাম পিয়াইন। এত স্বচ্ছ এই নদীর পানি যে, গভীর তলের প্রত্যেকটি কাঁকড়া ও চিংড়ির নড়াচড়া পর্যন্ত খালি চোখে পরিষ্কার দেখা যায়। দু’দিকের উঁচু ঢেউখেলানো পাহাড়গুলি সবুজ বনে ছাওয়া। তার ওপরে নীল আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি। আকাশের নীলিমা, মেঘের শুভ্রতা আর বনানীর সবুজ রং পিয়াইন নদীর জলে গলে গলে পড়ছে।

নদীর পারে ছড়িয়ে আছে চা বাগান আর কমলা বাগান। পানের বরজ। খাসিয়ার পল্লীতে মাচার ওপরে ঘরবাড়ি। নদীর চরে সাদা পাথর আর সোনালি বালুর বিছানা। দুপুরের রোদে ঝলসে ওঠে প্রস্তররাশি, চিকচিক করে জ্বলে বালিয়াড়ি। চারদিকে নিভৃত শান্তি, সুনসান নীরবতা। এইসব চোখজুড়ানো দৃশ্যচিত্র নিয়ে পৃথিবীর আশ্চর্য সুন্দর একটি স্থান জাফলং।

Jaflong Sylhet, iron bridge over the Piyain river
দুই পাহাড়কে একসূত্রে বেঁধেছে ঝুলন্ত ডাউকি সেতু।

শিলং মালভূমিতে ভারী বৃষ্টিপাতে ঘনঘন ঢল নামে পিয়াইন নদীতে, জলের তোড়ে নেমে আসে রাশি রাশি পাথর। এই পাথরকে বলা হয় ‘সাদা সোনা’। শ্রমিকেরা সারাদিন বালু খুঁড়ে খুঁড়ে পাথর তোলে নৌকোয়। এ-ই ওদের জীবিকা। দূর দূর থেকে যাঁরা ঘুরতে আসেন জাফলংয়ে, এই পাথর তোলার দৃশ্যটাও তাঁরা উপভোগ করেন।

উঁচু পাহাড়কে দু’ভাগ করে যেখান দিয়ে নেমে এসেছে পিয়াইন নদী, সেখানে দুই পর্বতপ্রান্তকে জুড়ে দিয়ে বানানো হয়েছে একটি ঝুলন্ত সেতু। ডাউকি সেতু। নিচে থেকে সেতুটা দেখায় সরু দড়ির মতো। কতকালের পুরনো এই সেতু, কে জানে! হয়তো ব্রিটিশরা বানিয়ে রেখে গেছে, উপনিবেশের যুগে। বাঁ দিকে পাহাড়ের গায়ে কালো একটা কাঠামো চোখে পড়ে। মন্দির-টন্দির ছিল হয়তো, সময়ের ছোপ পড়ে পড়ে কালো হয়ে গিয়েছে।

Jaflong Sylhet, workers collecting stones in Piyain river.
পিয়াইন নদীতে পাথর তুলে বারকি নৌকো বোঝাই করছেন শ্রমিকেরা।

জাফলং কীভাবে যাবেন

জাফলং বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। সিলেট শহর থেকে জাফলংয়ের দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার, উত্তর-পূর্ব দিকে। তাই বাংলাদেশের যে-কোনো জায়গা থেকেই আপনি যেতে চান, জাফলং ভ্রমণের জন্যে আপনাকে প্রথমে পৌঁছুতে হবে সিলেট শহরে। কাজেই আমরা এখানে প্রথমে দেশের বড় দুই নগরী ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাবার উপায় নিয়ে বলব, তারপর সিলেট থেকে জাফলংয়ের পথনির্দেশিকা।

ঢাকা থেকে সিলেট

ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, মহাখালী প্রভৃতি বাস টার্মিনাল থেকে সিলেটগামী বাসগুলো ছেড়ে যায়৷ জনপ্রিয় বাসগুলো হলো এনা, শ্যামলী, গ্রীন লাইন, ইউনিক ও লন্ডন এক্সপ্রেস। এসি বাসের ভাড়া হবে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে এবং নন-এসির ভাড়া ৪৭০ থেকে ৬০০ টাকা। ঢাকা থেকে সড়কপথে সিলেটের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার, পৌঁছুতে সময় লাগে সাধারণত ৬ ঘণ্টা। ঢাকা টু সিলেট বাস সার্ভিস সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য এবং বাস কাউন্টারগুলোর ফোন নম্বরের জন্যে দেখুন: Dhaka to Sylhet Bus: Ticket Price & Contacts.

আপনি যদি ট্রেনে ঢাকা থেকে সিলেট যেতে চান, তাহলে কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন বা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়তে পারেন। শোভন চেয়ারে ৩২০ টাকা এবং প্রথম শ্রেণীর ভাড়া হবে ৪২৫ টাকা। শ্রেণী ভেদে ট্রেনের টিকেটের মূল্য ২৬৫ থেকে ৭৫০ টাকা। ঢাকা থেকে রেলপথে সিলেটের দূরত্ব ৩১৯ কিলোমিটার, পৌঁছুতে সময় লাগে প্রায় ৭ ঘণ্টা।
ঢাকা টু সিলেট রুটের সমস্ত ট্রেনের সময়সূচি ও ভাড়ার বিস্তারিত তথ্য দেখুন এখানে: Dhaka to Sylhet Train Schedule and Ticket Price..

যেতে পারেন বিমানেও। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ, নভোএয়ার বা ইউএস বাংলা এয়ারের বিমানে সিলেট যেতে খরচ হবে ২৭০০ থেকে ১০,০০০ টাকা।

জাফলং (Jaflong), সিলেট পর্যটন।
জাফলং সিলেটের সর্বাধিক পরিদর্শিত পর্যটনকেন্দ্র।

চট্টগ্রাম থেকে সিলেট

আপনি যদি চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে সিলেট যেতে চান, তাহলে আপনার জন্যে রয়েছে দু’টি আন্তঃনগর ট্রেন উদয়ন এক্সপ্রেস ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেস। উদয়ন ছাড়ে রাত ০৯:৪৫-এ এবং পাহাড়িকা সকাল ০৯:০০টায়। ট্রেন ভাড়া শোভন ৩১৫, শোভন চেয়ার ৩৭৫ এবং প্রথম শ্রেণী ৫০০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী সব ট্রেনের সময়সূচি এবং সকল শ্রেণীর ভাড়া দেখে নিন এখানে: Chittagong to Sylhet Train Schedule with Ticket Price 2020.

যদি আপনি বাসে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট যেতে চান, তাহলে নন-এসি বাসের মধ্যে রয়েছে এনা, সৌদিয়া এবং বিআরটিসি বাস, বিআরটিসির ভাড়া ৬০০ এবং অন্যগুলির ৭০০ টাকা। এসি বাসের মধ্যে বেছে নিতে পারেন গ্রীন লাইন, সৌদিয়া বা লন্ডন এক্সপ্রেস, ভাড়া ১১০০-১২০০ টাকা।

সিলেট থেকে জাফলং

প্রকৃতিকন্যা জাফলং সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার দূরে। যেতে পারেন বাস, কার, অটোরিকশা বা লেগুনায়। সিলেট শহর থেকে জাফলং পৌঁছুতে দু’ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। খরচ কমাতে যদি লেগুনায় যান, তবে সময় লাগবে আরো কিছুটা বেশি। সিলেট শহরের শিবগঞ্জে পাবেন জাফলংগামী বাস, ভাড়া মোটামুটি ৮০ টাকা। সিএনজি স্টেশন আম্বরখানায়, সারাদিনের জন্যে সিএনজি রিজার্ভ নিলে খরচ হবে ১২০০-১৫০০ টাকা। চৌহাট্টা পয়েন্ট থেকে রিজার্ভ নিতে পারেন মাইক্রোবাসও, ভাড়া হতে পারে ৩০০০-৩৫০০ টাকা।

জাফলং (Jaflong)-এ সাদা পাথরের বিছানা।
জাফলং, পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা সাদা পাথরের বিছানা।

জাফলং হোটেল ও রিসোর্ট

জাফলংয়ে ভালো মানের হোটেল-রিসোর্ট নেই। তাই পর্যটকেরা ঘুরে দেখা শেষে রাত্রিযাপনের জন্যে ফিরে আসেন সিলেট শহরেই। সিলেট শহরের বন্দর বাজার, তালতলা, জিন্দাবাজার, দরগা গেইট, আম্বরখানা প্রভৃতি সব এলাকায়ই আবাসিক হোটেল রয়েছে। মাঝারি মানের হোটেলে থাকতে পারবেন ৫০০-১০০০ টাকার মধ্যে।

তবে আপনি যদি জাফলংয়েই থাকতে চান, তাহলে বেছে নিতে পারেন পর্যটন মোটেল জাফলং। এতে এসি টুইন বেড কক্ষের ভাড়া ১৮০০ টাকা এবং এসি কুইন বেড ২০০০ টাকা। রুম বুকিংয়ের জন্যে কল করতে পারেন পর্যটন মোটেল জাফলংয়ের ০১৮৯০০৪৯২৭৭ বা ০১৭৮০২৭৬০০২ নম্বরে।

এছাড়া নদী ও পাহাড়ের পাশে চমৎকার নৈসর্গিক পরিবেশে রয়েছে জৈন্তা হিল রিসোর্ট। জাফলং পর্যটনস্থল থেকে এটা ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। জৈন্তা হিল রিসোর্টে এসি ও নন-এসি কক্ষ ও কটেজ ভাড়া করতে পারবেন ২৫০০-৫০০০ টাকার মধ্যে। বুকিংয়ের জন্য ফোন: ০১৭১১-৭৩৯১৮৩।

Jaflong Sylhet, A huge rock in Jaflong
কত বড় পাথর দেখেছেন? শীতের ছবি। বর্ষায় পাথরটা ডুবে যায়।

জাফলং পর্যটন এলাকার পাশে মামার বাজারেও থাকতে পারেন আরো কম খরচে। এখানে আছে জাফলং ইন হোটেল, হোটেল প্যারিস সহ আরও কিছু হোটেল ও রেস্ট হাউজ। তবে এই বাজারটা শুকনো মৌসুমে একেবারে ধূলিধূসর আর বর্ষায় কর্দমাক্ত থাকে।

জাফলংয়ে খাবেন কোথায়

সিলেট শহরে খাওয়া-দাওয়া সেরে রওনা হোন। ভ্রমণ শেষে জাফলং পর্যটনস্থলের পাশের বাজারে সেরে নিন একপ্রস্থ হালকা নাশতা। এটাই ভালো হবে। অবশ্য মোটামুটি মানের রেস্তোরাঁ আছে ওই এলাকায়, যেমন: জাফলং ভিউ রেস্টুরেন্ট, সীমান্ত ভিউ রেস্টুরেন্ট এবং জাফলং পর্যটক রেস্টুরেন্ট। সিলেট শহরে ফিরে এসে বন্দর বাজারের পাকশি বা হোটেল এশিয়ায়, জিন্দাবাজার এলাকায় পানসী, পাঁচ ভাই, পালকি বা প্রীতিরাজে, চৌহাট্টায় আলপাইন রেস্তোরাঁয় কিংবা আম্বরখানার ইষ্টিকুটুম বা হাবিব রেস্তোরাঁয় আপনার পছন্দমতো খাবার খেয়ে নিতে পারেন।

জাফলং (Jaflong), সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র।
ঋতুতে ঋতুতে রূপ বদলায় জাফলং।

পর্যটন একটি বাংলাদেশি ভ্রমণ ওয়েবসাইট। এর কাজ হলো পর্যটককে পথ দেখানো। প্রথমে বাংলাদেশ, ক্রমশ এশিয়া এবং তারপর সারা দুনিয়ার সুন্দর সুন্দর পর্যটনকেন্দ্রগুলির তথ্য ও ছবি এক জায়গায় জড়ো করে আমরা গড়ে তুলতে চাই একটি ভ্রমণ বিশ্বকোষ—ট্যুরপিডিয়া, যেন নিসর্গ আর ইতিহাসের টানে গৃহত্যাগী মানুষেরা এ থেকে পান পথনির্দেশ, আর ঘুরকুনো কুঁড়েরা কুড়িয়ে নিতে পারে বেরিয়ে পড়বার জন্যে একমুঠো উৎসাহ। আপনার ঘরের কাছেই হয়তো অবহেলায় অগোচরে পড়ে আছে ঘুরে দেখার মতো চমৎকার কোনো জায়গা কিংবা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে শত শত বছরের পুরনো কোনো মসজিদ, আপনি কি তার কথা আমাদেরকে জানাবেন যাতে আমরা সেটা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরতে পারি?

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top